বৃহস্পতিবার ৮ অক্টোবর ২০২৬ - ১১:৪৩
পারমাণবিক বোমা ছাড়া ইরানই বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি

বিশ্ব রাজনীতিতে কোনো দেশের শক্তিমত্তা পরিমাপ করতে সাধারণত অর্থনৈতিক সক্ষমতা, সামরিক শক্তি, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, পারমাণবিক অস্ত্র, জ্বালানি সম্পদ এবং আন্তর্জাতিক জোটের মতো বিষয়গুলো বিবেচনা করা হয়। প্রচলিত এই হিসাব অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন বিশ্বের প্রধান পরাশক্তি। কিন্তু ইরানের শক্তিকে যদি কেবল প্রচলিত বস্তুগত মানদণ্ডে বিচার করা হয়, তাহলে এর প্রকৃত চিত্রটি ধরা পড়ে না। কারণ ইরানের শক্তির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো তাওহিদ, ঈমান, জনগণের দৃঢ়তা এবং প্রতিরোধের সংস্কৃতি।

হাওজা নিউজ এজেন্সি’র প্রতিবেদন উল্লেখ করেছে যে, এই দৃষ্টিকোণ থেকেই বলা যায়, পরমাণু বোমা ছাড়াই ইরান কীভাবে একটি প্রভাবশালী শক্তিতে পরিণত হয়েছে—এটি বুঝতে হলে দেশটির রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকাতে হবে।

তাওহিদের শক্তিতে ইসলামী বিপ্লব
ইমাম খোমেনি (রহ.) যখন ইরানে ইসলামী বিপ্লবের আন্দোলন শুরু করেন, তখন তাঁর হাতে ছিল না কোনো বিশাল সামরিক বাহিনী, আধুনিক অস্ত্রভাণ্ডার কিংবা শক্তিশালী রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক কাঠামো। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তিনি পূর্ব ও পশ্চিমের কোনো পরাশক্তির সমর্থন পাননি। বিপরীতে তাঁর সামনে ছিল শাহের শক্তিশালী রাষ্ট্রযন্ত্র, সামরিক বাহিনী এবং ব্যাপক রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামো।

তবুও শেষ পর্যন্ত সেই আন্দোলন সফল হয় এবং শাহের শাসনের অবসান ঘটে।

এই বিজয়ের পেছনে যে শক্তি কাজ করেছিল, তার কেন্দ্রবিন্দু ছিল তাওহিদ। ইমাম খোমেনি (রহ.)-এর কাছে তাওহিদ কেবল একটি ধর্মতাত্ত্বিক বিশ্বাসের বিষয় ছিল না; বরং এটি ছিল মানুষের চিন্তা, চরিত্র, সমাজ ও রাজনৈতিক জীবনে পরিবর্তন আনার একটি শক্তিশালী ভিত্তি।

তিনি কোরআন, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এবং আহলে বাইতের ইমামদের শিক্ষা থেকে তাঁর চিন্তার ভিত্তি গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর কাছে তাওহিদ ছিল এমন এক বিশ্বাস, যা মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে, ভয়কে জয় করতে এবং আল্লাহর ওপর নির্ভর করে দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ করে।

ইমাম খোমেনি (রহ.)-এর এই তাওহিদভিত্তিক চিন্তা যখন সামাজিক আন্দোলনের রূপ নেয়, তখন তা ইরানি জনগণের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও প্রতিরোধের শক্তি সৃষ্টি করে। বস্তুগত শক্তির প্রচলিত হিসাব-নিকাশকে অতিক্রম করে এভাবেই ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের পথে এগিয়ে যায়।

সূত্র: সাহিফায়ে ইমাম, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৩৮৭।

ইমাম খোমেনি (রহ.) থেকে শহীদ আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী
ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের পর সেই বিপ্লবী চেতনাকে ধরে রাখা এবং নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব আসে পরবর্তী নেতৃত্বের ওপর। আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ীর নেতৃত্বে বিপ্লবের পরিচয়, জাতীয় মর্যাদা ও আত্মবিশ্বাসকে আরও সুদৃঢ় করার চেষ্টা চালানো হয়।

তরুণ প্রজন্ম ও বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণিকে দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করা, দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জনগণের অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে বিপ্লবের আদর্শকে বাস্তব রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সমন্বিত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকে।

বাহরাইনের বিশিষ্ট আলেম শেখ ঈসা কাসেমও আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ীর নেতৃত্বকে ইমাম খোমেনি (রহ.)-এর বিপ্লবী ধারার ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখেছেন। তাঁর দৃষ্টিতে, এই নেতৃত্ব মুসলিম উম্মাহকে ইসলামের দিকে ফিরিয়ে আনা এবং ইমাম খোমেনি (রহ.)-এর রেখে যাওয়া পথকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

ইমাম খোমেনি (রহ.) তাওহিদের ভিত্তিতে বিপ্লবের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে প্রতিরোধের সংস্কৃতি, প্রতিরোধ অর্থনীতি, ‘জিহাদে তাবয়িন’—অর্থাৎ সত্য ও বাস্তবতা স্পষ্ট করার দায়িত্ব—এবং প্রতিরোধ-অক্ষের প্রতি সমর্থনের মাধ্যমে সেই ধারাকে আরও বিস্তৃত করা হয়।

পরমাণু বোমা ছাড়াই পরাশক্তি হওয়ার ধারণা
আজকের বিশ্বে একটি দেশের পরাশক্তি হওয়ার অন্যতম প্রচলিত মাপকাঠি হলো পারমাণবিক অস্ত্র। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার শক্তির অন্যতম ভিত্তি তাদের বিশাল সামরিক সক্ষমতা ও পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার। চীনের শক্তির পেছনে রয়েছে বিপুল অর্থনৈতিক সক্ষমতা, জনসংখ্যা ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি। কিন্তু ইরানের শক্তির চিত্রটি ভিন্ন।

ইরানের হাতে পরমাণু বোমা নেই। তবুও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি, ড্রোন সক্ষমতা, সামরিক গবেষণা, কৌশলগত নেটওয়ার্ক এবং আঞ্চলিক প্রভাবের ক্ষেত্রে দেশটি উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা অর্জন করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জনগণের রাজনৈতিক ও সামাজিক সমর্থন এবং প্রতিরোধের আদর্শ।

এই সমন্বয়ই ইরানের শক্তির একটি স্বতন্ত্র মডেল তৈরি করেছে—যেখানে সামরিক সক্ষমতার পাশাপাশি আদর্শ, জনগণ ও প্রতিরোধের চেতনাকে শক্তির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

সামরিক সক্ষমতা ও প্রতিরোধের নতুন সমীকরণ
ইরানের সামরিক সক্ষমতার মধ্যে নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র, উন্নত ড্রোন এবং বিভিন্ন কৌশলগত সামরিক নেটওয়ার্ক বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব সক্ষমতার পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে জনগণের সমর্থনকে ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে দেখা হয়।

সাম্প্রতিক সরাসরি সংঘাতের অভিজ্ঞতাও এই সমীকরণকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। ইরানের হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি সামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দাবি করা হয়েছে এবং এর ফলে সেগুলোর কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। একই সঙ্গে এই সংঘাত আঞ্চলিক রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কৌশলগত অবস্থান নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

এখানে ইরানের শক্তি শুধু ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনে সীমাবদ্ধ নয়। সামরিক সক্ষমতার সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিরোধ, সামাজিক সংহতি এবং জনগণের অংশগ্রহণ যুক্ত হওয়ায় একটি বহুমাত্রিক প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।

যুদ্ধে জনগণের ভূমিকা
ইরানের প্রতিরোধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো জনগণ। অর্থনৈতিক যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার সময় জনগণের অংশগ্রহণ, দেশীয় উৎপাদনকে সমর্থন, সামাজিক সহায়তা এবং বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে।

এখানে প্রতিরোধ কেবল যুদ্ধক্ষেত্রের বিষয় নয়। একজন উদ্যোক্তা যখন দেশীয় উৎপাদন বাড়ান, একজন গবেষক যখন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেন, একটি পরিবার যখন অপ্রয়োজনীয় ভোগ কমায় কিংবা সাধারণ মানুষ যখন দেশের অর্থনীতিকে সমর্থন করে—এসব কর্মকাণ্ডও বৃহত্তর প্রতিরোধের অংশ হয়ে ওঠে।

এই দৃষ্টিভঙ্গিতে জনগণ কেবল রাষ্ট্রের সমর্থক নয়; বরং জাতীয় শক্তির অন্যতম প্রধান উপাদান।

‘জিহাদে তাবয়িন’: তথ্যযুদ্ধের মোকাবিলা
আধুনিক বিশ্বে যুদ্ধ শুধু অস্ত্র দিয়ে সংঘটিত হয় না। তথ্য, প্রচারণা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং জনমতও যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। প্রতিপক্ষের বিভ্রান্তিকর প্রচারণা, বাস্তবতার বিকৃতি এবং মনস্তাত্ত্বিক চাপ মোকাবিলায় সত্য ও বাস্তবতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বাড়ছে।

এই প্রেক্ষাপটে ‘জিহাদে তাবয়িন’—অর্থাৎ সত্য ও বাস্তবতাকে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা—একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে সামনে এসেছে।

মানুষের চিন্তা ও উপলব্ধিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা যখন যুদ্ধের একটি অংশ হয়ে দাঁড়ায়, তখন সঠিক তথ্য তুলে ধরা এবং বিভ্রান্তি দূর করাও প্রতিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে ওঠে।

প্রতিরোধ অর্থনীতি: সংকটকে সম্ভাবনায় রূপান্তর
অর্থনৈতিক যুদ্ধের মোকাবিলায় প্রতিরোধ অর্থনীতি শুধু আত্মরক্ষার কৌশল নয়; বরং সংকটকে সম্ভাবনায় রূপান্তরের একটি পথ।

দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি, জ্ঞানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, ছোট ও মাঝারি শিল্পকে শক্তিশালী করা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অপ্রয়োজনীয় ভোগ কমানো—সবকিছুকেই এই অর্থনৈতিক প্রতিরোধের অংশ হিসেবে দেখা হয়।

একটি ছোট কারখানা যখন দেশীয় পণ্য উৎপাদন করে, একটি জ্ঞানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান যখন নতুন প্রযুক্তি তৈরি করে কিংবা একজন ভোক্তা যখন অপ্রয়োজনীয় আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় পণ্য বেছে নেয়, তখন এসব উদ্যোগ বৃহত্তর অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ভিত্তি শক্তিশালী করে।

পরিবর্তনের সূচনা নিজেদের ভেতর থেকে
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন— “নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থার পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন করে।” —সূরা রা‘দ, ১৩:১১

এই আয়াতের আলোকে একটি জাতির পরিবর্তনকে কেবল রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের ফল হিসেবে দেখা যায় না; বরং জনগণের চিন্তা, বিশ্বাস, আচরণ ও কর্মের পরিবর্তনও এর গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

ইরানের ইসলামী বিপ্লব, পবিত্র প্রতিরক্ষা যুদ্ধ, দীর্ঘস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার মোকাবিলা এবং প্রতিরোধের বিভিন্ন পর্যায়কে জনগণের অংশগ্রহণের ফল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। যখন জনগণ সক্রিয়ভাবে মাঠে নেমেছে, তখনই বড় ধরনের পরিবর্তনের পথ তৈরি হয়েছে।

শক্তির প্রকৃত ভিত্তি কোথায়?
ইরানের শক্তি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত এসে দাঁড়ায়—একটি দেশের প্রকৃত শক্তি কি শুধু তার অস্ত্রভাণ্ডার, অর্থনীতি কিংবা পারমাণবিক সক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ?

এই দৃষ্টিকোণ থেকে ইরানের আদর্শ একটি ভিন্ন উত্তর সামনে আনে। তাওহিদ মানুষের চিন্তাকে শক্তি দেয়, ঈমান তাকে দৃঢ়তা দেয়, জনগণের অংশগ্রহণ রাষ্ট্রকে সামাজিক ভিত্তি দেয় এবং প্রতিরোধের সংস্কৃতি তাকে দীর্ঘমেয়াদি চাপ মোকাবিলার সক্ষমতা দেয়।

এ কারণেই ইরানের শক্তিকে শুধু সামরিক বা অর্থনৈতিক পরিমাপে বিচার করলে এর একটি বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যায়।

ইরান আজ ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। তার শক্তির মূল ভিত্তি হিসেবে সামনে রয়েছে ঈমান, তাওহিদ, আত্মবিশ্বাস, জনগণের ইচ্ছাশক্তি এবং প্রতিরোধের চেতনা। পরমাণু বোমা ছাড়াই একটি দেশ কীভাবে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে—ইরানের অভিজ্ঞতা সেই প্রশ্নের একটি স্বতন্ত্র উত্তর হিসেবে সামনে এসেছে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha